খাদ্যে ভেজাল – একটি সামাজিক ব্যাধি ও বহুবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ

খাদ্যে ভেজাল – একটি সামাজিক ব্যাধি ও বহুবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ

খাদ্যে ভেজাল - একটি সামাজিক ব্যাধি ও বহুবিধ স্বাস্থ্যঝুকির কারণ

মানুষের জীবনধারনের জন্য খাবার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। মায়ের গর্ভে যখন একটি শিশুর জন্মের প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন থেকে পরবর্তীতে বেড়ে উঠা এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মানুষের জন্য খাবার প্রয়োজন। সৃষ্টির আদিকাল থেকে চলছে মানুষের খাবারের যোগানোর পিছনে অবিরাম ছুটে চলা। যখন আগুন আবিষ্কার হয়নি তখন মানুষ ফলমূল কাঁচা খাবার খেয়ে জীবনধারণ করতো। সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে মানুষের খাবারেও পরিবর্তন আসতে থাকে। আগুন আবিষ্কারের পরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আাসে মানুষের খাওয়ার সংস্কৃতিতে ফলমূলের সাথে মানুষ সিদ্ধখাবারে অভ্যস্ত হতে শুরু করে। শুরুর দিকে মানুষ জানতো ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য খাবার প্রয়োজন। না খেলে মানুষ বাঁচতে পারবে না। খাবার কিভাবে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে বা কাজে কর্মে সাহায্য করে তা মানুষ জানতো না। বিজ্ঞানের উৎকর্সতার সাথে সাথে মানুষ জানতে পারলো খাবারের ভিতর বিভিন্ন ধরনের উপাদান থাকে। খাবারের ভিতর থাকে ছয় ধরনের মৌলিক উপাদান এবং সেগুলো হলোঃ

 . কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা

. প্রোটিন বা আমিষ

. ফ্যাট বা তৈল জাতীয় খাবার

. ভিটামিন

. মিনারেল এবং

. পানি

 

কার্বোহাইড্রেড বা শর্করা জাতীয় খবারের প্রধান কাজ হলো শরীরে শক্তি জোগানো বা ক্যালরী জোগান দেয়া। শরীরের ভিতর প্রতিনিয়ত হাজারো ক্রিয়া-বিক্রিয়া হচ্ছে যার চালিকাশক্তি হচ্ছে এই ক্যালরী। ক্যালরী বা শক্তি ছাড়া শরীরের সমস্ত কাজ বন্ধ হয়ে যাবে এবং এক সময় নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হবে

 

প্রোটিন বা আমিষ শরীরের বিভিন্ন পেশী বা কোষ গঠনের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। আমিষ ছারা পেশী, হরমোন, এনজাইম ইত্যাদির কল্পনাই করা যায়না আমিষ শরীরের বিল্ডিংব্লক হিসাবে কাজ করে

 

ফ্যাট শরীরের শক্তি জোগানোর পাশাপাশি পেশী বা কোষ গঠনে আমিষের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে।ভিটামিন মিনারেল শরীরে বিভিন্ন ক্রিয়াবিক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে এবং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমুউনিটি দিতে সাহায্য করে।

পানি শরীরের জলীয় অংশকে ধারণ করে। জলীয় অংশ ছাড়া সমস্ত কিছু অচল হয়ে যাবেসৃষ্টিকর্তা মানুষের শরীরের ভিতর বিভিন্ন জটিলসব কর্মকান্ডের সৃষ্টি করেছেন যেখানে প্রতিটি খাদ্যের উপাদানের আলাদা আলাদা ভূমিকা নির্ধারণ করা আছে। শরীরের ভিতর কর্মকান্ডগুলো যাতে সুচারুভাবে নিরলসভাবে চলতে থাকে তার জন্য খাদ্যের উপাদানগুলোর যথাযথ মান নিয়ন্ত্রিত হওয়াটা খুবই আবশ্যক। খাদ্যে ভেজাল দিলে খাদ্যের উপাদানে গুনগত পরিবর্তন আসে যা শরীরের অন্তর্নিহিত কর্মকান্ডকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং স্বাস্থ্যহানি জীবনহানির ঝুঁকি দেখা দেয়

খাদ্যে ভেজাল বিষয়টি দুইভাবে সম্পন্ন হয়ঃ

. অসাবধানতাবশতঃ বা অনিচ্ছাকৃতঃ এটি সাধারণতঃ জ্ঞান দায়িত্বসচেতনতার অভাবে হয়ে থাকে অসাবধানতাবশতঃ ভেজাল-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহারণ হলো ফসলে পোকা-মাকর নিয়ন্ত্রন করতে বেহিসেবি বা যেনতেনভাবে পেস্টিসাইড ব্যবহার করা এতে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল ভেজালযুক্ত হয়ে যেতে পারে।

. ইচ্ছাকৃত বা অধিক মুনাফালাভের আশাঃ ইচ্ছাকৃত বা অধিক মুনাফালাভের আশায় খাদ্যের সাথে নিম্নমানের খাবার বা খাদ্য নয় এমন বস্তু মিশানো হয়ে থাকে। ইচ্ছাকৃত ভেজালটি সবচেয়ে ক্ষতিকারক। কারণ এখানে অধিক মুনাফার প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে অনেকসময় এমন সব কেমিক্যাল খাদ্যে মিশানো হয় যা স্বাস্থের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক

খাদ্যেভেজাল স্বাস্থঝুঁকি

. বিভিন্ন ধরনের রং- খাদ্যে রং মিশানো একটি অতি সাধারণ ঘটনা। খাদ্যকে আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন ধরণের রং মিশানো হয়ে থাকে। কপার, জিংক, ইন্ডিগোবেজ্ড ডাই ইত্যাদি। সাধারনতঃ বিভিন্ন বেভারেজ বা কোমল পানিয় এবং এলকোহলে এমনকি খাদ্য শস্যে বিভিন্ন ধরনের রং মিশানো হয়ে থাকে। এগুলো স্বাস্থের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। এইসব রং থেকে হয়ত তাৎক্ষনিক কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় না কিন্ত্ত দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের মত রোগ দেখা দিতে পারে

. এমাইলাম- এগুলো একধরনের পলিসেকারাইড বা কমপ্লেক্স শর্করা। শস্যকে আরও ঘন করার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। এটিও স্বাস্থের জন্য বেশ ক্ষতিকারক।
. কেইন সুগার এটি মধুর সাথে মিশানো হয়। এটি শরীরকে স্থূলকায় করে দেয়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত করে, চোখ এবং স্নায়ূর মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে

. ইউরিয়া চাউলকে আরও উজ্জল করতে, মুড়িকে আরও সাদা ধবধবে করতে, মাছ-মাংস শব্জির রক্ষণাবেক্ষণ করতে এটিকে প্রিজারভেটিভ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় খামারীরা গরু পালনে বিশেষ করে কোরবানির জন্য গরু স্বল্পসময়ে মোটাতাজা করতে গরুর খাবারে ইউরিয়া মিশিয়ে থাকে। এইক্ষেত্রে ইউরিয়া গরুর শরীরে মিশে যায় এবং উক্ত গরুর মাংশ খেলে দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্নরকম পার্শ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন শরীর স্থুলকায় হয়ে যায়, পায়ে বিমেষ এক ধরনের ঘাঁ হয়, ত্বকে ফুসকা পড়ে, এমনকি কিডনি লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে

. ফরমালিন সাধারণতঃ পঁচনশীল খাবার যাতে সহজে পচে না যায় অর্থাৎ অধিকসময় ধরে পঁচনশীল খাবার যেমনফলমূল (আংগুর,আম, আপেল, কমলা, মাল্টা), মাছ-মাংস, শব্জি এমনকি দুধ দুগ্ধজাত মিষ্টি সংরক্ষণে ফরমালিনের সংমিশ্রণ করা হয়। ফরমালিনের বিষক্রিয়ায় কফকাশি, মাথা ব্যাথা শ্বাসকষ্ট হয়। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি লিভারের মারাত্মক ক্ষতি এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে

. কেলসিয়াম কার্বাইড এটি সাধারণতঃ ষ্টীলমিলে বা অয়েল্ডিংএর কাজে এবং আতশবাজি বা ছোট বোমা বানানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা এটিকে বিভিন্ন ফল পাকানোর কাজে ব্যবহার করে থাকে

ফল পাকার রহস্য

ফল পাকার সময় হলে প্রাকৃতিকভাবেই ফলে ইথিলিন-এর পরিমাণ বেড়ে যায়। ইথিলিন ফলে এক ধরনের এনজাইম (এমাইলেজ, পেক্টিনেজ ইত্যাদি) নিঃসৃত করে। এমাইলেজ-এর কাজ হলো ফলের জটিল শর্করাকে বিভাজন করে সাধারণ শর্করা বা সুক্রোজ এবং ফ্রুক্টোজে রুপান্তরিত করা ফলে ফল নরম সুস্বাদু হয়। পেক্টিনেজ এনজাইম-এর কাজ হলো ফলের ত্বককে নরম করা পাশাপাশি ত্বকের ক্লোরোফিল (যা সবুজ রং দেয়) পরিবর্তিত হয়ে কেরোটিনয়েড হয়ে যায় ফলে ফলের রং বদলে পাকা বা হলুদ রং ধারণ করে

ক্যালসিয়াম কার্বাইড কিভাবে ফল পাকায়

ক্যালসিয়াম কারবাইড পানি বা জলীয়বাস্পের সাথে মিশে কেলসিয়াম হাইড্রোক্সাইড এসিটাইলিন গ্যাস সৃস্টি করে। এই এসিটাইলিন গ্যাস ইথিলিন এর মত কাজ করে। ফলে সহজেই আমসহ যেকোন কাঁচা ফল পেকে যায়। কেলসিয়াম কার্বাইড দামে খুব সস্তা বিধায় দেশের ফলব্যবসায়ীরা অজ্ঞতাবশতঃ বা অতি মূনাফার লোভে সহজলভ্য কেলসিয়াম কার্বাইড দিয়ে ফল পাকিয়ে থাকে। ফল পরিণত হওয়ার আগেই ফল পাকানোর কাজটি সহজেই সম্পন্ন হয়ে যায় কৃত্রিমভাবে

ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বিষক্রিয়া

সাধারণতঃ পানিতে ক্যালসিয়াম কারবাইড মিশ্রিত করে সেই পানিতে ফল ভেজানো হয়। কেলসিয়াম কার্বাইড পানির সাথে মিশে এসিটিলিন নিঃসৃত করে ফল পাকিয়ে দিচ্ছে। একই সাথে কেলসিয়াম কার্বাইড ফলের ত্বকভেদ করে ফলের ভিতরে শাষে ঢুকে যায়। এই কেলসিয়াম কার্বাইডে মারাত্বক বিষ হিসাবে মিশ্রিত থাকে আরসেনিক ফসফরাস। এই আরসেনিক ফসফরাসও ফলের ভিতর ঢুকে যায়। ফল পাকার পড়েও ভিতরে এই আর্সেনিক ফসফরাস থেকে যায়। এইভাবে কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল খেলে শরীরের ভিতর বিষক্রিয়া চলতে থাকে। তাৎক্ষনিকভাবে হয়ত কোন প্রতিক্রিয়া নাও দেখা দিতে পারে অথবা অনেকসময় ত্বকে এলার্জি (রেশ) দেখা দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কিডনী অথবা লিভারের সমস্যা বা বিকল হয়ে যেতে পাড়ে। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়া। এই সমস্যাগুলো হয়তো দেখা দেবে ১৫-২০ বৎসর বা তারও পর আশংকা হচেছ বর্তমানে যেভাবে নৈতিকতাবিহীন বিষমিশানো কাজটি জনসম্মুখে বাধাহীনভাবে চলছে এবং সবাই বিশেষ করে শিশুরা যেভাবে ফলের সাথে বিষ খাচেছ তাতে কয়েকদশক পরে প্রায় প্রতি পরিবারে না হলেও সবার আত্বীয়-স্বজনের ভেতর এক বা একাধিক সদস্য পাওয়া যাবে যাদের কিডনী নষ্ট বা লিভরের সমস্যা অথবা দূরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত

আমেরিকাসহ উন্নত দেশেও কৃত্রিমভাবে ফল পাকানো হয় থাকে। কৃত্রিমভাবে ফল পাকানোটা দোষের কিছু নয়। তবে তারা এই ক্ষেত্রে ইথিলিন গ্যাস স্প্রে করে থাকে যা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে এইক্ষেত্রে খরচ বেশী পড়ে

 

ইথোপেন

বর্তমানে দেশে ইথোপেন স্প্রে করে আনারস পাকানো হচেছ। এই ক্ষেত্রে আনারস ক্ষেত থেকে কেটে আনার / দিন আগে বাগানে আনারসের গায়ে সরাসরি ইথোপেন স্প্রে করা হয়। এখানেও ইথোপেন আনারসের গায়ে ঢুকে যায়। উক্ত আনারস ট্রাক ভর্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে আনারস যখন ক্রেতার কাছে পৌছায় তখন এটি সুন্দর রংএর পাকা আনারস যার ভিতরে অপেক্ষা করে আছে ইথোপেন নামক বিষ- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কিডনী লিভার যার হাতে জিম্মি

শেষ কথা

বর্তমানে বাংলাদেশে ভেজালের সার্বজনীন যে উৎসব চলছে তাতে আমরা সবাই কমবেশী আক্রান্ত। সাধারণ যে ফলমূলগুলো আমর খাই বা ছেলেমেয়েদেরকে খেতে দেই যেমন কলা, আংগুর, আপেল, আম, আনারস প্রায় সবগুলোই কেমিক্যাল বা বিষ মিশানো। আবার রান্নার খাবার যেমন মাছ-মাংস, শব্জি এমনকি দুধ বা দুগ্ধজাত মিষ্টিতেও কেমিক্যাল এর মিশ্রণ। কোনটিতে পাকানোর জন্য বা কোনটিতে পঁচনরোধে বিভিন্ন রকম কেমিক্যাল মিশানো হচেছ। অবস্থা এমন যে ক্রেতা জানেন খাদ্যপণ্যটি কেমিক্যাল বা বিষমিশ্রিত তথাপি তিনি কিনছেন কারণ অন্য কোন সূযোগ আপাততঃ তার কাছে নেই। আমরা জানি ভেজাল খাবারটি নিজের এবং ছেলেমেয়েদের কিডনী এবং লিভারটিকে প্রতিনিয়তঃ একটু একটু করে নষ্ট করে দিচেছ। প্রায় প্রতিকারহীন এই অবস্থায় আমরা নিয়তির হাতে নিজের এবং সন্তানের ভাগ্যকে সমর্পণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি

এমনটি কি আশা করা যায় না!!!!!


সরকার কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিতে পারে যারা ব্যবসায়ীদের সাথে সিন্ডিকেট করে মৌশুমি ফলগুলো বাগানে নিরাপদ স্প্রের মাধ্যমে ফল পাকার ব্যবস্থা করতে পারে অথবা কেন্দ্রিয়ভাবে কোথাও ফল মজুদ করে পাকানোর পর বিক্রেতার কাছে ছেড়ে দিতে পারে। কোল্ডষ্টোরেজের মত একটি ফী-র ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।

পঁচনশীল পণ্যদ্রব্য যেমন মাছ, সব্জি ইত্যাদির ক্ষেত্রেও সরকার কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে

 

ডাঃমোঃছায়েদুলহক
এফ.সি.পি.এস, এম.এস (চক্ষু)
চক্ষুবিশেজ্ঞসার্জন
ন্যশনালআইকেয়ারসেন্টার
রিংরোড, শ্যামলী, ঢাকা।
প্রাক্তনসহযোগীআধ্যাপক
জাতীয়চক্ষুবিজ্ঞানপ্রতিষ্ঠানহাসপাতাল

 

muzammel hoque

muzammel hoque

Try to make a greener world.

Comments are closed

  • Topics related suggestions: