যক্ষা

যক্ষা

যক্ষা একটি বহুল বিস্তৃত ও পাণঘাতী সংক্রামক রোগ। সাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবার কুলোসিস জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হলে এই রোগ হয়। যক্ষা সাধারনত ফুসফুসে হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগ সাধারনত: বাতাসের মাধ্যমে ছড়াইয়া থাকে। কোন যক্ষা রোগী যখন কাশি দেয় বা হাঁচি দেয় তখন জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সংক্রমনেরই বহি:প্রকাশ হয় না। এদেরকে সুপ্ত যক্ষা বলে। সুপ্ত যক্ষার প্রতি ১০ জনের ১ জন প্রকৃত যক্ষাতে ভোগে। যদি চিকিৎসা না করা হয় তবে ৫০ ভাগেরও বেশিরভাগ লোক মৃত্যুবরণ করে।

যক্ষা রোগীর উপসর্গের মধ্যে কাশি, রক্তমাখা কফ, জ্বর, রাত্রিতে শরীরে ঘাম হওয়া এবং ওজন কমে যাওয়া অন্যতম। শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হলে আরও ভিন্ন রকমের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যক্ষা রোগটি বর্তমানে কার্যকর কিনা তা নির্ণয় করার জন্য বুকের এক্সরে করতে হয়। কফ কিংবা শরীরের কোন আক্রান্ত অংশের রস নিয়ে অনুবীক্ষন যন্ত্রের সাহায্যে কিংবা কালচার করে দেখতে হয়। সুপ্ত যক্ষা নির্ণয় করার জন্য চামড়ায় টিউবারকুলীন পরীক্ষা বা রক্ত পরীক্ষা করতে হয়। যক্ষা রোগের চিকিৎসা কঠিন এবং এতে অনেকগুলি এন্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন ধরে খেতে হয়। যে সকল লোক যক্ষা রোগীর সংস্পর্শে আছে তাদের পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি কারও যক্ষা রোগ পাওয়া যায়, তবে তাদেরও চিকিৎসা করতে হবে। ইতিমধ্যে অনেক এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে গেছে। ইহা একটি বাড়তি সমস্যা। এই রোগের প্রতিরোধ নির্ভর করে ভেকসিন দেওয়ার উপর এবং সন্দেহভাজন লোকদের পরীক্ষা করে রোগ ধরা পড়লে তাদের চিকিৎসা করার উপর। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ লোক এই রোগে সংক্রামিত। প্রত্যেক বৎসর এদেরও এক ভাগ লোক অসুখে আক্রান্ত হতে পারে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। কারন তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। বিশেষ করে যারা এইচ আই ভি সংক্রামিত বা এইডস রোগে আক্রান্ত।

উপসর্গ:

যক্ষা শরীরের যে কোন অংশে হতে পারে তবে সাধারনত: এই রোগ ফুসফুসে হয়ে থাকে বেশী। ফুসফুসের বাহিরেও যক্ষা হতে পারে; অনেকসময় যুগপৎভাবে ফুসফুসে এবং ফুসফুসের বাহিরেও এই রোগ হতে পারে। সাধারনভাবে এই রোগে যেসকল উপসর্গ দেখা যায় তন্মধ্যে জ্বর, কাঁপুনি, রাতে শরীরে ঘাম দেওয়া, ক্ষুধামন্দা, শরীরের ওজন কমে যাওয়া এবং ক্লান্তি অন্যতম। অনেকের নকে ক্লাবিং দেখা দিতে পারে।

ফুসফুস:

যক্ষা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে ফুসফুসকে আক্রমন করে থাকে। ইহাতে দীর্ঘস্থায়ী কাশি হতে পারে, কফ আসতে পারে। প্রায় ২৫ ভাগ রোগীর কোন উপসর্গ থাকে না। অনেকসময় রোগীর কাশির সাথে অল্প রক্ত আসতে পারে। কিন্তু যদি কখনও সংক্রমন দ্বারা রক্তনালী ক্ষয়প্রাপ্ত হয় তবে অনেক বেশী পরিমান রক্ত যেতে পারে। যক্ষা একটি দীর্ঘস্থায়ী  অসুখ এবং ইহা ফুসফুসের উপরিভাগে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ফুসফুসের নিম্নভাগের চেয়ে উপরিভাগ বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকে। কারন হিসাবে মনে করা হয় ফুসফুসের উপরিভাগে অক্সিজেন সরবরাহ বেশী এবং সেখান থেকে লসিকা রস নির্গত হয় কম।

ফুসফুসের বাহিরে:

১৫ থেকে ২০ ভাগ রোগীর যক্ষা ফুসফুসের বাহিরেও বিস্তার লাভ করতে পারে। বুকে ব্যথা হতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী কাশি হতে পারে। প্রায় ২৫ ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে কোন উপসর্গ দেখা দেয় না। কখনও কখনও রোগীর কাশির সাথে সামান্য রক্ত আসতে পারে। আবার কখনও কখনও যদি যক্ষার কোন সংক্রমন রক্তনালীকে ছেদ করে থাকে তবে সেখান থেকে প্রচুর রক্ত আসতে পারে। যক্ষা দীর্ঘস্থায়ী অসুখে পরিনত হতে পারে এবং ফুসফুসের উপরিভাগ ব্যাপকহারে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে শক্ত হয়ে যেতে পারে। ফুসফুসের উপরিভাগ নিম্নভাগের চেয়ে বেশী হারে যক্ষা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ইহাদেরকে একত্রে ফুসফুসের বাহিরের যক্ষা বলা হয়ে থাকে। এই ধরনের যক্ষা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের হয়ে থাকে এবং বাচ্চাদের হয়ে থাকে। এই ধরনের যক্ষা এইচ আই ভি আক্রান্ত রোগীদের ৫০ ভাগেরও বেশী ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। ফুসফুসের বাহিরে আক্রান্ত যক্ষা রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফুসফুসের আবরণীতে, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতে, গলার লসিকাগ্রন্থিতে, প্রজনন অঙ্গে ও মূত্রনালী ও মূত্রথলিতে এবং হাড় ও হাড়ের সন্ধিতে। যখন ইহা হাড়ে বিস্তার লাভ করে তখন অস্টিওমাইলাইটিস নামক রোগ হয়ে থাকে। অনেক সময় যক্ষা জনিত ফোড়া ফেটে গিয়ে চামড়া ঘা দেখা দিতে পারে। এই ঘাতগুলি সাধারনত: ব্যথা যুক্ত হয়ে থাকে, ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং দেখতে অনেক ধৌত করা চামড়ার মত খুবই ভয়ানক বিস্তৃত আকারের যক্ষাকে মিলিয়ারী যক্ষা বলা হয়ে থাকে। ফুসফুসের বাহিরের যক্ষার ১১ ভাগ অন্তত: এই ধরনের মিলিয়ারী প্রকৃতির।

কারণ:

মাইকোব্যাকটেরিয়া

যক্ষার প্রধান কারন হল মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস যাহা একটি ক্ষুদ্র গতিহীন রঙের মত দেখতে। এই ব্যাকটেরিয়া দুর্বল জীবাণুনাশক সহ্য করতে পারে এবং শুষ্ক অবস্থায় কয়েক সপ্তাহ বেঁচে থাকতে পারে। প্রকৃতিতে এই ব্যাকটেরিয়া অন্য জীবাণুর মধ্যে বৃদ্ধি পেতে পারে কিন্তু মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস ল্যাবরেটরীতে কালচার করা যায়। কফ রঞ্জিত করে অনুবীক্ষন যন্ত্রের সাহায্যে দেখে এই জীবাণু নির্ণয় করা যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ ফ্যাক্টর:

বিভিন্ন ধরনের ফ্যাক্টরের কারনে লোকজনের মধ্যে যক্ষারোগের সংক্রমন হয়ে থাকে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হল এইচআইভি সংক্রমন। এইচ আই ভি সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে ১৩ ভাগেরও বেশী রোগীর যক্ষা হয়ে থাকে। সাধারণত লোকদের মধ্যে যক্ষার সংক্রমন হলে ৫ থেকে ১০ ভাগ লোকের যক্ষা রোগের বহি:প্রকাশ ঘটে থাকে আবার এইচ আই ভি সংক্রমিত লোকদের বেলায় যক্ষা রোগের সংক্রমন হলে অন্তত: ৩০ ভাগ লোকের যক্ষা রোগের বহি:প্রকাশ ঘটে থাকে।

যেখানে লোকজন ঠাসাঠাসি করে থাকে এবং যাদের পুষ্টি কম তারা যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে অর্থাৎ যক্ষা প্রধানত: গরীব লোকজনের হয়ে থাকে। যে সকল লোক অবৈধ ড্রাগ বহন করে থাকে। যে সকল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ লোকজন যেমন: কয়েদি, ঘরছাড়া লোকজন জমায়েত হয় সেই সকল এলাকার লোকজন যাদের চিকিৎসা সুবিধা  কম। সম্পদহীন লোকজন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যক্ষারোগীদের সংস্পর্শে আসা বাচ্চারা এবং সর্বোপরি যারা এদেরকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে তারা যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের অসুখও এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। যাদের সিলিকসিস অসুখ আছে তারা ৩০ ভাগেরও বেশী যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ধুমপায়ীরা অধূমপায়ীদের থেকে দ্বিগুণ হারে যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে।

অন্যান্য অসুখে আক্রান্ত হলেও যক্ষা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এদের মধ্যে এলকোহলে আসক্তি এবং ডায়াবেটিস এদের মধ্যে যক্ষারোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ৩ থেকে ৪ গুন বেড়ে যায়।

কোন কোন ঔষধ যেমন: ষ্টেরয়েড একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা।

বংশগত জেনেটিক সম্ভাব্যতা বিরাজমান, তবে ইহা এখনও পুরাপুরি অনির্ধারিত আছে।

পদ্ধতি:

বিস্তার:

যখন কোন যক্ষারোগী কাশে, হাঁচি দেয়, বা থুথু ফেলে তখন তারা যক্ষারোগের জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। একটি মাত্র হাঁচি বাতাসে ৪০ হাজার কণা ছড়িয়ে দেয়। এই প্রত্যেকটি কণাই যক্ষারোগ ছড়াইতে সক্ষম যেহেতু খুব কম সংখ্যক জীবাণুই যক্ষারোগ করতে পারে। সাধারনত: শ্বাসের সাথে ১০টিরও কম ব্যাকটেরিয়া ঢুকলে যক্ষারোগ হতে পারে।

যেসকল লোক যক্ষা রোগীর সংস্পর্শে আসে তাদের যক্ষা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী (২২%) । একজন যক্ষা রোগী যদি সে চিকিৎসা না পায় তবে সে বৎসরে ১০-১৫ লোককে সংক্রমিত করতে পারে। যাদের কার্যকরী যক্ষা রোগ আছে তারাই শুধু যক্ষারোগ ছড়াতে পারে। কিন্তু যাদের শরীরে যক্ষারোগ সুপ্ত অবস্থায় আছে তারা যক্ষারোগ ছড়াতে পারে না। যক্ষা রোগ একজনের কাছ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াবে কিনা তা নিম্নলিখিত ফ্যাক্টর এর উপর নির্ভরশীল-

রোগী কত সংখ্যক সংক্রমিত থুথু কণা বের করবে, ভেকসিনের কার্যকারিতা, কতদিন যাবৎ রোগীর সংস্পর্শে আছে, যক্ষা রোগের জীবাণুর সংক্রমন ক্ষমতা কতটুকু, অসংক্রমিত লোকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটুকু ইত্যাদির উপর। লোক থেকে লোকে যক্ষা রোগ বিস্তার রোধ করতে হলে যারা যক্ষারোগে আক্রান্ত তাদেরকে পৃথক করে চিকিৎসা দিতে হবে। ২ সপ্তাহ চিকিৎসা পাওয়ার পর কোন যক্ষারোগী আর রোগ ছড়াতে পারে না যদি না ওষুধ অকার্যকর হয়ে থাকে। যদি কোন লোক নতুনভাবে সংক্রমিত হয়ে থাকে তবে ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় পর সে অন্য লোককে সংক্রমিত করতে পারবে।

রোগতত্ত্ব:

প্রায় ৯০ ভাগ লোক যারা যক্ষারোগে সংক্রমিত তাদের কোন লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় না। মাত্র ১০ ভাগ লোকের কার্যকরী যক্ষারোগ দেখা দেয় সারা জীবনে। কিন্তু যদি সাথে এইচ আই ভি সংক্রমন থাকে তবে প্রতি বৎসর ১০ ভাগ লোকের কার্যকরী যক্ষারোগ হবে। যদি কার্যকরী চিকিৎসা দেওয়া না হয় তবে ৬৬ ভাগ যক্ষারোগী মারা যায়।

প্রথম যে সংক্রমন হয় সেটিকে গণ ফোকাস (Ghon focus) বলা হয়ে থাকে। ইহা সাধারণত ফুসফুসের নিচের অংশের উপরিভাগে অথবা উপরিভাগের নিচের অংশে হয়ে থাকে। রক্তের মাধ্যমেও ফুসফুস সংক্রমন হতে পারে। ইহা সাধারনত: ফুসফুসের উপরিভাগে হয়ে থাকে। রক্তের মাধ্যমে যক্ষারোগ দূরবর্তী স্থানেও বিস্তার লাভ করতে পারে, যেমন: দূরবর্তী লসিকাগ্রন্থি, কিডনী, মস্তিষ্ক এবং হাড়। শরীরের সব জায়গায়ই যক্ষারোগ হতে পারে কিন্তু অজ্ঞাত কারনে হার্ট, মাংশপেশী, অগ্ন্যাশয় ও থাইরয়েড গ্রন্থিতে যক্ষারোগ সাধারনত: হয় না।

যদি যক্ষারোগের জীবানু কোন আক্রান্ত স্থান থেকে কোন ভাবে রক্তে ঢুকতে পারে তবে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং একত্রে বিভিন্ন জায়গায় সংক্রমন করতে পারে এবং ছোট ছোট সাদা দানার মত দেখা যেতে পারে। সাংকেতিক রকমের যক্ষারোগ যা সাধারনত: বাচ্চাদের এবং এইচ আই ভি সংক্রমিত রোগীদের হয়ে থাকে তাকে মিলিয়ারী যক্ষা বলা হয়ে থাকে। যে সকল রোগীর এই ধরনের যক্ষা দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে চিকিৎসা দেওয়ার পরও মৃত্যুর হার শতকরা ৩০ ভাগ। অনেক লোকের এই সংক্রমন মাঝে মাঝে বাড়ে ও কমে। প্রথমে তন্তু ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় পরে আবার তা শক্ত হয়ে যায়। এবং শরীরের ভিতরের গহবর গুলি ধ্বংশপ্রাপ্ত তন্তু দ্বারা ভরে যায়। কার্যকরী যক্ষা রোগে এই গহবর গুলি অনেকসময় শ্বাসনালীর সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। ফলে এই ধ্বংশপ্রাপ্ত তন্তুগুলি কফের সাথে বের হয়ে আসে। এই ধ্বংশপ্রাপ্ত তন্তুর মধ্যে জীবিত যক্ষারোগের জীবাণু থাকে ফলে ইহা দ্বারা সংক্রমন বিস্তার লাভ করে থাকে। উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক দ্বারা চিকিৎসা করলে এই জীবাণু মারা যায় এবং সুস্থতা ফিরে আসে। উপযুক্ত যত্ন  নিলে এই সংক্রমিত স্থান গুলি পরে সুস্থ হয়ে শক্ত হয়ে যায়।

রোগ নির্ণয়:

কার্যকরী যক্ষা:

উপসর্গের উপর নির্ভর করে কার্যকরী যক্ষা নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের বেলায়ও রোগ নির্ণয় করা অত্যন্ত কঠিন। যদি ফুসফুসের উপসর্গ ও শারীরিক উপসর্গগুলি ২ সপ্তাহের বেশী স্থায়ী হয় তবে যক্ষা রোগের চিন্তা ভাবনা করতে হবে। প্রাথমিকভাবে বুকের একটি এক্সরে করতে হবে এবং কফ পরীক্ষা করে দেখতে হবে জীবাণু আছে কিনা। উন্নয়নশীল বিশ্বে চামড়ার টিউবারকুলীন (Tuberculin) পরীক্ষার গুরুত্ব খুবই কম। যক্ষা রোগের নিশ্চিত নির্ণয় নির্ভর করে কফ, পুঁজ ও তন্তুতে যক্ষা রোগের জীবানু খুঁজে পাওয়া। কিন্তু রক্ত কিংবা কফ কালচার করতে ২ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে। কাজেই অনেক সময় কালচার রিপোর্ট পাওয়ার পূর্বেই চিকিৎসা শুরু করতে হয়। পিসি আর এবং এডিএ পরীক্ষা করে দ্রুত যক্ষা রোগ নির্ণয় করা যায়। এই পরীক্ষাগুলি সাধারনত: করা হয় না। যক্ষা রোগের বিরুদ্ধে রক্তে এন্টিবডি নির্ণয় করে নির্দিষ্টভাবে এই রোগের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না বিধায় এই পরীক্ষাগুলি সচরাচর করা হয় না।

সুপ্ত যক্ষা:

যে সকল লোকের যক্ষা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশী তাদের বেলায় মান্টো টিউবারকুলীন পরীক্ষা চামড়ায় করা হয়। যাদের আগে এই ভেকসিন দেওয়া আছে তাদের এই পরীক্ষা পজিটিভ হতে পারে। যারা অপুষ্টিতে ভোগে, যাদের অন্য রোগ আছে যেমন: সারকোয়েডসিস, লিম্ফোমা ইত্যাদি তাদের বেলায়ও এই পরীক্ষা নেগেটিভ হতে পারে। এমন কি ক্ষেত্রবিশেষে যাদের কার্যকরী যক্ষা রোগ আছে তাদের বেলায়ও কখন কখন এই পরীক্ষা নেগেটিভ হতে পারে।

প্রতিরোধ:

যক্ষা রোগ প্রতিরোধ নির্ভর করে বাচ্চাদের টীকা দেওয়াতে এবং কার্যকরী যক্ষারোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দেওয়াতে। কিন্তু স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে এই রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে।

ভেকসিন:

বিসিজি হল যক্ষারোগের একমাত্র ভেকসিন। বাচ্চাদের বেলায় এই ভেকসিন নিলে সংক্রমনের হার ২০ ভাগ কমে যায় এবং সংক্রমন থেকে কার্যকরী যক্ষার রুপান্তর ৬০ ভাগ কমে যায়। ইহাই পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ব্যবহৃত ভেকসিন। পৃথিবীর প্রায় ৯০ ভাগ শিশুকে এই ভেকসিন দেওয়া হয়। এই ভেকসিন দেওয়াতে শরীরে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠে তা প্রায় ১০ বৎসর স্থায়ী হয়।

চিকিৎসা:

যক্ষা রোগের চিকিৎসায় সাধারনত: এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে জীবাণুকে ধ্বংশ করা হয়। যক্ষারোগের কার্যকরী চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন, কারণ যক্ষারোগের জীবাণুর যে গঠন তা জীবাণুর ভিতর এন্টিবায়োটিক প্রবেশে বাধাদান করে থাকে ফলে অনেক এন্টিবায়োটিক তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। যে দুটি এন্টিবায়োটিক সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয় তা হলো আইসোনিয়াজিড (Isoniazid) এবং রিফামপিসিন (Rifampicin)। চিকিৎসা কয়েক মাস যাবৎ স্থায়ী হতে পারে। সুপ্ত যক্ষারোগের চিকিৎসা সাধারনত: ১টি এন্টিবায়োটিক দ্বারা করা যেতে পারে। কিন্তু কার্যকরী যক্ষারোগের বেলায় বেশ কয়েকটি এন্টিবায়োটিক যুগপৎভাবে ব্যবহার করতে হয় যাতে করে জীবাণুগুলি কোনভাবেই এন্টিবায়োটিকে অকার্যকর হতে না পারে। যে সকল লোকের সুপ্ত যক্ষারোগ আছে তাদেরও চিকিৎসা করতে হয় যাতে তারা পরবর্তীতে কার্যকরী যক্ষারোগে রুপান্তরিত না হয়। যারা নিয়মিত ঔষুধ সেবন করে না তাদের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোন স্বাস্থ্যসেবাদানকারীর উপস্থিতিতে ঔষধ সেবন করার ব্যবস্থা করেছে ইহাকে ডট থেরাপি (Dot Therapy )বলে থাকে। দেখা গেছে যে, মানুষ স্বাধীনভাবে ঔষধ সেবন করলে সেখানে অনিয়ম হয়ে থাকে বেশী। ফলে এই ব্যবস্থায় ঔষধ সেবন কিছুটা নিয়মিত হয় এবং ইহাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

নতুন রোগী:

যখন যক্ষারোগী প্রথমে নির্ণয় হয় তখন তাকে ৬ মাসে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সাধারনত: তাদেরকে একত্রে আইসোনিয়াজিড (Isoniazid) এবং রিফামপিসিন (Rifampicin), পাইরিজিনামাইড (pyrizinamide) এবং ইথামবুটল (Ethambutol) এই চারটি ঔষধ ২ মাস দেওয়া হয়। পরবর্তী ৪ মাস আইসোনিয়াজিড (Isoniazid) এবং রিফামপিসিন (Rifampicin) দেওয়া হয়।

যক্ষারোগ পুনরায় হলে:

যদি যক্ষারোগ পুনর্বার হয় তাহলে চিকিৎসা দেওয়ার আগে কোন এন্টিবায়োটিক কার্যকর তা নির্ণয় করতে হবে। যদি একের অধিক ঔষধ অকার্যকর হয়ে থাকে তবে কার্যকর আছে এমন ৪টি ঔষধ দীর্ঘ ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত সেবন করতে হবে।

ঔষধের অকার্যকারিতা:

ঔষধের প্রাথমিক অকার্যকারিতা বলতে বুঝায় রোগী প্রথমেই ঔষধ কাজ করে না এমন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। যদি রোগী ঔষধে কার্যকর এবং জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয় তবু পরবর্তীতে ঔষধ অকার্যকর হতে পারে- যেমন: যদি রোগী অপর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়ে থাকে, নিয়মিত ঔষধ না খায় কিংবা নিম্নমানের ঔষধ খেয়ে থাকে। ঔষধ অকার্যকর যক্ষারোগী অনুন্নত বিশ্বে একটি সমস্যা। কারণ এর চিকিৎসা দীর্ঘস্থায়ী ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

রোগীর ভবিষ্যত:

যক্ষারোগের জীবাণুতে সংক্রমন হলে তা কার্যকরী যক্ষারোগে পরিণত হয়। যদি জীবাণুগুলি শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিক্রম করতে পারে এবং তা যদি বংশ বিস্তার করতে পারে। প্রাথমিক যক্ষারোগে ১ থেকে ৫ ভাগের বেলায় ইহা সংক্রমেন পরপরই হতে পারে। কিন্তু বেশীরভাগ লোকের বেলায় ইহা সুপ্ত অবস্থায় থাকে কোন উপসর্গ ছাড়াই। এই সুপ্ত অবস্থা থেকে এরা ৫ থেকে ১০ ভাগ পর্যন্ত কার্যকরী যক্ষারোগে রুপান্তরিত হতে পারে বহু বৎসর পর। সুপ্ত অবস্থা থেকে কার্যকরী যক্ষায় রুপান্তর বেড়ে যেতে পারে যদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়- যেমন: রোগী যদি এইচ আই ভি দ্বারা সংক্রমিত হয়। যদি রোগীর একই সাথে যক্ষারোগের জীবাণু দ্বারা ও এইচ আই ভি দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে প্রতি বৎসর অন্তত: ১০ ভাগ কার্যকরী যক্ষায় রুপান্তরিত হবে। যক্ষারোগে মৃত্যুবরণ করার সম্ভাবনা প্রায় ৪ ভাগের।

পরিসংখ্যান:

পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক যক্ষারোগের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত এবং প্রায় ১ ভাগ লোক প্রতি বৎসর নতুন করে আক্রান্ত হয়। যাহোক, বেশীর ভাগ সংক্রমনই কার্যকরী যক্ষারোগে পরিণত হয় না এবং ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ সংক্রমন সুপ্ত থাকে। সংক্রমিত হয়ে যে সকল লোক মারা যায় তাদের মধ্যে দ্বিতীয় হল যক্ষারোগ এবং প্রথম হল এইচ আই ভি সংক্রমন। যক্ষারোগীর সংখ্যা এবং নতুনভাবে আক্রান্ত যক্ষারোগীর সংখ্যা উভয়ই দিন দিন কমের দিকে। যক্ষা উন্নয়নশীল বিশ্বে বেশী, এশিয়ার প্রায় ৮০ ভাগ লোকেরই টিউবারকুলীন পরীক্ষা পজিটিভ। যক্ষারোগকে পুরাপুরি নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব নয়। কারন কোন কার্যকরী ভেকসিন এখনও তৈরী হয়নি, রোগ নির্ণয় ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক মাস ধরে চিকিৎসা করতে হয়। এইচ আই ভি সংক্রমিত যক্ষারোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং ঔষধে অকার্যকর যক্ষারোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি।

বয়সের সাথে যক্ষারোগীর সংখ্যার তারতম্য হতে দেখা যায়।

 

ডাঃ এ কে এম আমিনুল হক

অধ্যাপক (অবঃ) মেডিসিন বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

Last updated by at .

muzammel hoque

muzammel hoque

Try to make a greener world.

Comments are closed

  • Topics related suggestions: