পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য

পেশাগত নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য বলতে আমরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি বা কর্মীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বুঝি। এই ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা কতটুকু সেটিই বুঝায়। কর্মের পরিবেশটা যাতে স্বাস্থ্য সম্মত হয় সেটিও আমাদের লক্ষ্যের বিষয়। এই পরিবেশের সাথে যারা জড়িত যেমন- সহকর্মীবৃন্দ, পরিবারবর্গ এমনকি যারা ক্রেতা এবং ঐ পরিবেশে বিচরণ করে তাদের স্বাস্থ্য রক্ষণকেও বুঝায়।

সাধারণত : যারা কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে থাকেন তাদেরই এই দিকটা দেখাশুনা করতে হবে। বিশ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে স্বাস্থ্যের সকল দিক এবং নিরাপত্তার সকল দিক নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতাকে বুঝায়। শুধুমাত্র অসুখের অনুপস্থিতিকেই স্বাস্থ্য বুঝায় না। একজন ব্যক্তি তার পেশাগত দায়িত্ব পালনে যাতে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয় কিংবা নূনতম ক্ষতি হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। কর্মক্ষেত্রে কোন কর্মী যাতে আকস্মিক দুর্ঘটনা কবলিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

সাধারনত : ৩টি লক্ষ্যে কাজ করতে হয় কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশের উন্নয়ন ও কাজের এমন ব্যবস্থাপনা যাতে কাজের সময় পরিবেশটা সুস্বাস্থ্যের দিকে থাকে। মানসিক অবস্থা, রোগের পরিসংখ্যান, ফিজিওথেরাপি, পুনর্বাসন, পেশার আংশিক পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রের আয়োজন স্বাস্থ্য সম্মত হতে হবে। পূর্ববর্তী কোন কার্যক্রম যদি কোন সমস্যার সৃষ্টি করে থাকে তবে তা পরিহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দেহের অবস্থান সঠিক হতে হবে। নিদর্িৃষ্ট সময় পর পর বিরতিতে যেতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কর্মীর শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক অবস্থানের সর্বোচ্চ পরিচর্যা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। খনির পরিবেশ তুলনামূলক ভাবে খারাপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও কাজ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সাহায্য করে থাকে তবুও সে কাজ করতে গিয়ে মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যায়। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে কেমিক্যাল, বায়োলজিক্যাল এজেন্ট, পরিবেশগত অবস্থা, এলারজেন, মানসিক ও সামাজিক অবস্থা। যে সকল মেশিনারিতে শব্দ বেশী সেগুলিতে কাজ করলে মানুষ শ্রবণ শক্তি হারায়। কর্মক্ষেত্রে পড়ে গিয়েও মানুষ ব্যথা পায়। এমনকি মারাও যেতে পারে যেমন- নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে কিংবা মালামাল স্থানান্তর করতে গিয়ে।  মেশিনের চলমান অংশ থাকতে পারে, ধারালো অংশ থাকতে পারে এবং গরম অংশ থাকতে পারে। এগুলিতে কর্মীরা আঘাত পেতে পারে, কেটে যেতে পারে কিংবা পুড়ে যেতে পারে। বায়োলজিক্যাল স্বাস্থ্য সমস্যা বলতে আমরা বুঝি সংক্রামক জীবাণু দ্বারা অথবা তাদের বিষদ্বারা আক্রান্ত হওয়া যেমন- এনথ্রাক্স। কর্মীরা ইনফ্লুয়েঞ্জা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। পশু কামড়াতে পারে কিংবা পোকা মাকড় হুল ফুটাতে পারে। কর্মক্ষেত্রে কেমিক্যালের সংস্পর্শে আসলে ক্যানসারের সম্ভাবনা দেখা দেয়। কর্মক্ষেত্রে বেশী সময় থাকলে বা চাকুরীতে অনিশ্চয়তা থাকলে মানসিক ও সামাজিকভাবে কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেশাগত স্বাস্থ্য সমস্যা প্রকারভেদে ভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন- যারা নির্মাণ কাজ করে তারা পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে পারে। এমনকি মারাও যেতে পারে। আবার যারা নদীতে কিংবা সাগরে মাছ ধরে তারা ডুবে মরতে পারে। যে সকল পেশা বিপদ সংকুল তন্মধ্যে মাছ ধরা, আকাশে বিচরণ করা, করাত দিয়ে কাঠ চিরা, ধাতু নিয়ে কাজ করা, ক্ষেতে খামারে কাজ করা, খনিতে কাজ করা এবং যানবাহন চলাচলে কাজ করা ইত্যাদি। যে সকল পেশাতে মানসিক ও সামাজিক সমস্যা আছে সেগুলি হল কর্মক্ষেত্রে সন্ত্রাস যেমন যারা স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন তারা পুলিশ এবং শিক্ষকবৃন্দ।

নির্মাণ :

নির্মাণ হলো একটি অতি সাংঘাতিক পেশা। কারণ ইহাতে বহুলোক আহত হয় এবং মারা যায়। নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে পড়ে যাওয়াই ইহার একমাত্র কারণ। এই সকল বিপদ থেকে রেহাই পেতে গেলে শরীরে বর্মের আচ্ছাদন ব্যবহার করতে হবে, সঠিকভাবে লোহার কিংবা কাঠের বেড়া ব্যবহার করতে হবে, ভাল মই ব্যবহার করতে হবে এবং পরিদর্শনের জন্যে ভালভাবে মঞ্চ তৈরী করতে হবে। তবেই দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে। নির্মাণ শ্রমিকদের মধ্যে ধূমপানের অভ্যাস বেশী। তারা বাষ্প, গ্যাস, ধূলা ও ধোঁয়ার সম্মুখীন হয় বেশী।

কৃষি :

যারা কৃষি কাজে নিয়োজিত তাদের অনেকেই ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয়। যারা ট্রাক্টর দিয়ে চাষাবাদ করে তাদের শ্রবণ শক্তি নষ্ট হতে পারে, চর্ম রোগ হতে পারে এবং কেমিক্যালের জন্য কিংবা অতিরিক্ত রোদের কারণে শরীরে ক্যান্সার দেখা দিতে পারে। কৃষি কাজে যারা বিষ ব্যবহার করে তাদের অসুখ দেখা দিতে পারে। এমনকি জন্মগত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অনেক সময় পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরাও কৃষি কাজে সহায়তা দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে তাদেরও অসুখ বিসুখ হতে পারে।

চাকুরী:

চাকুরীজীবিগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বসে কাজ কর্ম করেন। ফলে তাদের স্থুলতা দেখা দেয়, অনেকেই পেশাগত মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। আবার অনেকের নির্দিষ্ট সময়ের বেশী কাজ করতে হয়, অনেকেই আবার চাকুরীতে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। খনি, তেল ও গ্যাস উত্তোলন: যারা খনিতে কাজ করেন কিংবা তেল ও গ্যাস উত্তোলনে কাজ করেন তাদের অনেক সময় ক্ষতিকর কেমিক্যালের সম্মুখীন হতে হয়। এদের অনেকেই অতিরিক্ত সময় কাজ করে থাকেন। এই কেমিক্যাল্স যখন চর্মে লাগে তখন চর্ম রোগের সৃষ্টি হয়। এদের বেশীর ভাগই বাষ্প, গ্যাস, ধূলা ও ধোঁয়ার সম্মুখীন হয়।

স্বাস্থ্য সেবা এবং সামাজিক সহযোগিতা :

পেশাগত দায়িত্বপালনে অসুস্থতায় যে সকল রোগী ভর্তি হয় তাদের মধ্যে আঘাতই বেশী। বেশীর ভাগ রোগী পা ফসকাইয়া বা পড়ে গিয়ে ব্যথা পায়। আবার অনেকেই সন্ত্রাসের শিকার হয়েও ব্যথা পায়।

  • পাইলট অনেক সময় দুর্ঘটনায় কবলিত হয়ে মারা যায়
  • যারা বর্জ্য সংগ্রহ করে কিংবা পরিষ্কার করে তারা অনেক সময় আঘাত প্রাপ্ত হয়ে থাকে।
  • যারা গো-মহিষাদি চরিয়ে থাকে।
  • যারা ইলেক্ট্রিসিটি নিয়ে কাজ করে।
  • যারা ছাদের কাজ করে।
  • যারা ট্রাক বা ভারি যান চালায়।
  • যারা পাহাড়ের খাদে কাজ করে।
  • যারা অগ্নিনির্বাপনে কাজ করে থাকে।

এদের সকলেরই মাংস পেশীতে কিংবা হাড়ে আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে আঘাত প্রাপ্তদের বেশীর ভাগই পুরুষ।

 

অধ্যাপক ডা: এ কে এম আমিনুল হক

প্রাক্তন অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Comments are closed

  • Topics related suggestions: