সফল চিকিৎসা ও ডাক্তার রোগীর সর্ম্পক

 

একজন রোগী তার জীবনের বিশেষ মুর্হুতে ডাক্তারের শ্বরণাপন্ন হন; যেমন জন্ম, মৃত্যু এবং অসুস্থতাজ্বনিত কষ্টের সময়। এটি এমন এক সময় যখন একজন রোগী দ্বীধাহীন চিত্তে একজন চিকিৎসকের উপর আস্থা ও ভরসা রাখতে চান। একজন চিকিৎসক চিকিৎসা শ্বাস্ত্রে জ্ঞান, দক্ষতা র্অজন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত  হন। অসুখের বৃত্তান্ত উপর্সগ ইত্যাদি জেনে বিভিন্ন পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে ডায়াগনোসিসের মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা দিতে সচেষ্ট থাকনে। সফল চিকিৎসার পেছনে চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ ভূমিকা নিয়ামক হিসাবে কাজ কর। চিকিৎসক ও রোগীর এই বুঝাপড়া বা সম্পর্কটিকে বলা যায় চিকিৎসক-রোগী সর্ম্পক। চিকিৎসক-রোগীর এই সর্ম্পকটি গড়ে উঠে নিজেদের অর্জিত জ্ঞান এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থার উপর। এক্ষেত্রে আস্থার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বর্পূণ। শ্রদ্ধার ঘাটতি হলে আস্থা শংকটে পড়ে। আস্থা যেমন কিনতে পাওয়া যায় না তেমনি দাবী করে আদায় করা যায় না। এটি আসলে র্অজন করতে হয়।

চিকিৎসা প্রদানের বিষয়টি প্রাচীনকাল থকেইে চিকিৎসক নির্ভর ছিল। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। বদলে গেছে চিকিৎসা ব্যাবস্থা। আবিস্কার হয়েছে ব্যয়বহুল অনেক চিকিৎসা সরঞ্জাম। সরকারের পাশাপাশি নতুন নতুন বিনিয়োগকারী এখন চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশাল সব আয়োজন নিয়ে উপস্থিত । চিকিৎসা এখন কেবলেই এক মানবিক বিষয় নয়। এটি এখন একটি রীতিমত বানিজ্য। মানবিক বিষয়টি দ্রুত বানিজ্যীকরণরে ফলে মনোজগতেও চলছে নানা ঘাত প্রতিঘাত। ইতিমধ্যে সমাজে এর প্রতিফলন সুস্পষ্ট। চিকিৎসা ক্ষেত্রে চিকিৎসক -রোগীর জায়গায় এখন পক্ষ তিনটি; রোগী – চিকিৎসক – হাসপাতাল বা প্রতষ্ঠিান। নতুন এই প্রেক্ষাপটই এখন বাস্তবতা।

এই তিন পক্ষের স্বার্থ কিছুটা সাংর্ঘষিক। হাসপাতাল যখন সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে দিয়ে চিকিৎসককে  প্রভাবিত করার চষ্টো করে এবং চিকিৎসক প্রভাবতি হয়ে প্রয়োজনাতরিক্তি পরীক্ষা নিরিক্ষা বা অস্ত্রোপচার ইত্যা্দির মাধ্যমে হাসপাতালরে মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করে তখন রোগীর স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। আবার উচ্চ বেতন এবং আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে একজন চিকিৎসক সবসময় রোগীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গেলে হাসপাতালের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। এই ক্ষেত্রে চিকিৎসক এবং হাসপাতাল দুপক্ষই নিজেদের মধ্যে যোগসাজসের মাধ্যমে কাজ করলে রোগীর স্বার্থ মারাত্বকভাবে ক্ষুন্ন হওয়ার আশংকা থাকে । এই ত্রিমিুখী স্বার্থের সংঘাতের জায়গাটিতে ভারসাম্য রাখতে হলে দরকার রোগী এবং চিকিৎসকের মধ্যে দৃঢ় সর্ম্পক এবং হাসপাতালের মানবিক মূল্যবোধ।

আস্থার জায়গাটি যেভাবে নষ্ট হয় –

১. কিছু রোগী বিশেষ করে সমাজে উচু স্তরে যাদের অবস্থান তাদের মনোভাব হলো পরীক্ষা নিরীক্ষা যা কিছু  আছে সব করে দ্রুত রোগী ভালো করে দিতে হব। রোগের ধরণ কি বা পরিণতি কি এসব বুঝতে চান না। আবার একই রোগী যদি গরীব হয় তার মনোভাব হলো এত পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার কি? বিশেষ করে যখন ব্যয়বহুল হয়ে যায় চিকিৎসা ।

২. চিকিৎসা কাজে ব্যস্ততার কারনে বা ঊন্মাসিকতার কারণে চিকিৎসকগন রোগীর সাথে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি  ভালোভাবে শেয়ার করেন না বা শেয়ার করার প্রযোজন মনে করনে না। আবার অনেক সময় সিস্টেমের মধ্যেই বিষয়টির ঘাটতি থাকে ফলে সুযোগের অভাবে অনেক সময় চিকিৎসক রোগীর সাথে ভালোভাবে শেয়ার করতে পারেন না। এমতাবস্থায় রোগী কিছুটা অন্ধকারে থাকেন এবং কিছুটা অসহায়ত্বে ভোগেন। রোগীর মনে সন্দেহ দানা বাধে চিকিৎসক কার স্বার্থ দেখছেন ? রোগীর / হাসপাতালের / নাকি নিজের ?

৩. অনেক সময় হাসপাতাল রোগী আকৃষ্ট করার জন্য ভুল তথ্য সরবরাহ করে থাকে। রোগী হাসপাতালে এসে যখন হোচট খান অর্থাৎ প্রত্যাশার যায়গায় গরমিল পান তখন কিছুটা আশাহত হন। আর সরাসরি প্রতিক্রিয়াটা  পড়ে চিকিৎসকের উপর ।

৪. রোগী অনেক সময় চিকিৎসক ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে এক করে দেখেন। ফলে হাসপাতাল অব্যবস্থাপনার দায়ভার চিকিৎসকের উপর চাপিয়ে দেন।

 

আস্থার জায়গাটি অক্ষুন্ন রাখতে করনীয়-

চিকিৎসকের করণীয় –

১. রোগীর কথাগুলি ভাল করে শুনতে হবে, বুঝতে হবে। রোগীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। রোগীর প্রয়োজন ও সার্মথ্য বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা প্রক্রিয়াটি বিশেষ করে র্দীঘমেয়াদী, ব্যয়বহুল ও সংকটাপন্ন চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীকে যতটুকু সম্ভব অবহিত করে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

২. রোগীকে রোগ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য প্রদান করার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচতেন করার কাজটি অব্যাহত রাখতে হবে। যদিও এব্যাপারে রোগীর আগ্রহ ও সক্ষমতা নিয়ামক হিসাবে কাজ করে। ভুল তথ্য বা অজ্ঞতা রোগীর প্রত্যাশা অনেক বাড়িয়ে দেয় যা বাস্তবে হতাশার জন্ম দিয়ে থাকে।

রোগীর করণীয়-

১. রোগীকে যথেষ্ট স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে। সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিৎ করতে হলে স্বাস্থ্যবিষয়ক সঠিক তথ্যাদি পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। গবেষনায় দেখা যায় যারা স্বাস্থ্যসচেতন নন তাদের স্বাস্থমান ভালো নয়; হাসপাতালে তাদের বেশী বেশী চিকিৎসা নিতে হয় এবং তারাই বেশী বেশী ভুল চিকিৎসার শিকার হন।

২. সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় ও ব্যয়বহুল এবং র্দীঘমেয়াদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে অধিকতর ধৈর্য়্যশীল ও বিবেচনাপ্রসুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অবশ্যই সামর্থ্যের মধ্যে থেকে চিকিৎসা নিতে হবে।

৩. উশৃঙ্খল আচরণ কখনোই চিকিৎসা সহায়ক নয়।

হাসপাতালের করণীয়-

১. রোগীকে মিথ্যা আশ্বাস বা প্রলোভনের  ফাঁদে ফেলার চেষ্টা না করে সঠিক তথ্য উপাত্য দিয়ে রোগীকে সাহায্য করতে হবে।

২. রোগীর সার্মথ্যের মধ্যে চিকিৎসা প্রদানের চেষ্টা করতে হবে। লাগামহীন মোনাফার লোভে চিকিৎসকের উপর অহেতুক প্রভাব বিস্তার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. স্বাস্থ্যসবোর মানবিক দিকটি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাই পারে একটি সুস্থ জাতি উপহার দিতে।

 

ডা: মো: ছায়দেুল হক

চক্ষুবিশেষজ্ঞ ও সার্জন

জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক ও প্রবন্ধকার

E-mail: sayedul.hq@gmail.com

Last updated by at .

Comments are closed

  • Topics related suggestions: