স্নায়ু বেদনা

স্নায়ু বেদনা বলতে আমরা বুঝি একটি বা একাধিক স্নায়ুর গতিপথে ব্যাথা। যেমন- পাজরের স্নায়ু বেদনা, ট্রাইজমিনাল স্নায়ু বেদনা  এবং গ্লসোফেরিজিয়াল স্নায়ু বেদনা ।

শ্রেণীবিভাগ

স্নায়ু বেদনাকে বিভিন্ন ভাবে ভাগ করা হয়ে থাকে। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনা, অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনা, অক্সিপিটাল স্নায়ু বেদনা, অক্সিপিটাল স্নায়ু বেদনা, প্লসোফেরিন্ডিয়াল স্নায়ু বেদনা এবং হারপিস পরবর্তী স্নায়ু বেদনা । সারাটিকা ও ব্র্যাকিয়াল প্লেক্সাস-এ যে ব্যাথা হয় সেটিও স্নায়ু বেদনার অন্তর্ভুক্ত।

অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনা

অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনা এক ধরনের অপ্রতুল স্নায়ু বেদনা এবং অনেক সময় ইহা নির্ণয় করা ভূল হতে পারে। ইহাকে ভূলবশত: মাইগ্রেন, দাঁতের সমস্যা, টেম্পরোমেন্ডিবুলার হাড়জোড়ার সমস্যা মাংশ ও হাড়ের ব্যাথা এবং হাইপোকন্ড্রিয়াসিসস মনে হতে পারে। অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনার বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং ব্যাথার তীব্রতার তারতম্য হতে পারে- অল্প ব্যাথা থেকে ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার মত ব্যাথা হতে পারে কিংবা জ্বালাপোড়া করতে পারে। এমনকি সাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনার মত তীব্র ব্যথা হতে পারে। অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু বেদনার ব্যথা ভারী , তীব্র এবং জ্বালাপোড়ার মত হতে পারে। ভূক্তভোগীদের সারাক্ষণ মাইগ্রেনের মত মাথাব্যথা থাকতে পারে এবং সে ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর সকল শাখায় ব্যথা অনুভব করতে পারে। ইহার আওতায় দাঁতের ব্যথা, কানের ব্যথা  সাইনাসে ভরা ভরা অনুভব করা, গালে ব্যথা, কপালে ব্যথা এবং কপালের পার্শ্বে ব্যথা, চিবুকে ব্যথা, চোখের চারপাশে ব্যথা এবং কখনও কখনও ইলেক্ট্রিক শকের মত ব্যথা। এই ধরনের ব্যথায় মাথার পিছনে ও ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে যা সাধারন স্নায়ু বেদনার মত নয়। ব্যথা আরও তীব্র আকার ধারন করতে পারে বিশেষ করে কথা বলার সময়, মুখের ভাব প্রকাশ করার সময়, চিবানোর সময় এবং বিশেষ অনুভূতির সময়- যেমন ঠান্ডা বাতাস লাগার মত। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুর উপর- রক্তনালীর চাপ দাঁতের ও সাইনাসের জীবাণু সংক্রমন, শারীরিক আঘাত বা অতীতে ভাইরাল প্রদাহ অসাধারন ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুবেদনার কারণ হতে পারে।

ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুবেদনাতে আক্রান্ত রোগী স্নায়ু স্পর্শ তাপ ও চাপ মুখমন্ডলে অনুভব করে থাকে। মুখমন্ডল বলতে চিবুক থেকে কপাল পর্যন্ত বুঝায়। এই ধরনের সমস্যায় স্বল্প সময়ের জন্যে তীব্র ব্যথা হয় সাধারনত: ২ মিনিটের কম সময়ে এবং মুখের একপাশে হয়ে থাকে। এই ব্যথাকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। যেমন- ছুরি মারা, তীক্ষ্ণ বিদ্যুত চমকানোর মত, জ্বালাপোড়ার মত এবং এমন কি চুলকানির মত। কিন্তু অসাধারন ট্রাইজেমিনাল  স্নায়ুবেদনাতে স্নায়ুর গতি পথে সারাক্ষণ তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে পারে। ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুবেদনার যে ব্যথা হয় তা তীব্র ব্যথার মধ্যে একটি যা আমরা অনুভব করি।

সাধারণ উত্তেজনা- যেমন খাওয়া দাওয়া, কথাবলা, মুখের ভাব প্রকাশ করা, মুখ ধোওয়া, যে কোন হালকা স্পর্শ বা অনুভব একটি আক্রমন রচনা করতে পারে (এমন কি ঠান্ডা বাতাসের অনুভূতিও)। আক্রমনটি একাকী হতে পারে। বারে বারে হতে পারে এমন কি সারাক্ষণ থাকতে পারে। কোন কোন রোগী মাংশপেশীর সংকোচন অনূভব করে থাকে যে কারনে ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুবেদনার আদি নামকরণ করা হয়েছিল টিক ডলোরা।

গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল

গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল স্নায়ুবেদনাতে গলার পিছন দিকে বারবার ব্যথা হয়ে থাকে। টনসিলের আশে পাশে ব্যথা হয়ে থাকে। জিহবার পিছনের দিকে ব্যথা হয়ে থাকে এবং কানের অংশবিশেষে ব্যথা হয়ে থাকে। ব্যথা সাধারনত: গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল স্নায়ুর অস্বাভাবিক ক্রিয়ার জন্যে হয়ে থাকে যা গলার পেশীকে নাড়ায় এবং গলা, টনসিল ও জিহবা থেকে খরা সংগ্রহ করে মস্তিষ্কে পৌছায়। গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল স্নায়ুবেদনা, খুবই বিরল একটি অসুস্থতা যা ৪০ বছর বয়সের পরে শুরু হয় এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষদের বেলায় হয়ে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ইহার কারণ জানা যায় না। যাহোক গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল স্নায়ুবেদনা কখনও কখনও অস্বাভাবিক জায়গায় অবস্থিত ধমনীর কারনে হতে পারে যা গ্লসোফেরিঞ্জিয়াল স্নায়ুকে চাপ দেয় যখন ইহা মস্তিষ্ক থেকে বের হয়। বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক বা ঘাড়ের টিউমার ইহার কারণ হতে পারে।

অক্সিপিটাল

অক্সিপিটাল স্নায়ু বেদনা এক ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা হয় বিশেষ করে ঘাড়ের উপরিভাগে মাথার পিছনে এবং চোখের পিছনে।

মেকানিজম

স্নায়ুতে ক্ষত হলে স্নায়ুতে যে পরিবর্তন দেখা যায় তা বুঝতে পারলে স্নায়ুর অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণ বুঝা যায় যা স্নাবেদনার কারন হতে পারে।

প্রান্তিক স্নায়ু ক্ষত

স্নায়ুতে ক্ষত হলে কি পরিমান পরিবর্তন আসবে স্নায়ুতে তা নির্ভর করে স্নায়ুর ক্ষতটি কত তীব্র তার উপরে। স্নায়ুতে ক্ষত হওয়ার পর কিছু অন্তবাহী আবেগ তৈরী হয়। যদিও ইহা মিনিট খানেক স্থায়ী হয় তবুও ইহা স্নায়ুবেদনা সৃষ্টি করতে পারে। যখন একটি স্নায়ুকোষের এক্সন ক্ষত হয় তখন ক্ষতের দূরবর্তী অংশ ধ্বংশ হয়ে যায় এবং সোয়ান কোষ সেটাকে আত্তীকরণ করে। ক্ষতের পূর্ববর্তী অংশ মিলিত হয়। পশ্চাদপসরন করে এবং ফুলে যায়। তখন এটাকে পশ্চাদপসরণ ভাল্ব বলে। স্নায়ুর সংযোগস্থল কর্মহীন হয়ে পড়ে যেহেতু একসনের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং কোন নিউরোট্রান্সমিটার তৈরী হয় না। ধ্বংসপ্রাপ্ত এক্সনের নিউক্লিয়াসে পরিবর্তন আসে যাতে এক্সনকে পূর্ণনির্মান করা। ক্ষতের পরবর্তী সোয়ান কোষ এবং সোয়ান কোষ নির্গত রস এক্সনের পূর্ণনির্মানে সাহায্য করে। এক্সন পূর্ণনির্মানের পর সঠিক জায়গায় সংযুক্ত হতে হবে সঠিকভাবে কার্যকর হওয়ার জন্যে। যদি সঠিক জায়গায় সংযুক্তি না হয় তবে অন্য জায়গায় সংযুক্ত হয়ে যেতে পারে। যদি পূর্ণনির্মিত এক্সন ধ্বংশপ্রাপ্ত তন্তু দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় তবে সেখানে নিউরোফিব্রিলস একটি বলের তৈরী করতে পারে থাকে নিউরমা বলে।

যেখানে ক্ষত স্নায়ু ধ্বংশপ্রাপ্ত হয় কিংবা পূর্ণনির্মিত হয় না সেখানে স্নায়ু তার কার্যক্ষমতা হারায় বা ঠিকমত কাজ করতে পারে না। স্নার ক্ষত কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এবং আশেপাশের স্নায়ুরও ক্ষতি করতে পারে। যখন এক বা একাধিক স্নায়ু তাদের কার্যক্ষমতা হারায় বা অস্বাভাবিক কাজকর্ম করে থাকে তখন অস্বাভাবিক সংকেত মস্তিষ্কে যায় এবং মস্তিষ্ক তা ব্যথা বলে চিহ্নিত করে থাকে। ধ্বংশপ্রাপ্ত স্নায়ুর প্রান্তদেশ ফুলতে আরম্ভ করে এবং সংযোগস্থল থেকে পার্শ্ববর্তী অংশে অন্য স্নায়ুর দিকে সরিয়ে দেয়। প্রায়ই ধ্বংশপ্রাপ্ত স্নায়ুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশেষ করে সংবেদনশীল স্নায়ুর স্নায়ুবেদনার কারণ হতে পারে।

রোগ নির্ণয়:

রোগ নির্ণয় নির্ভর করে ধ্বংশপ্রাপ্ত স্নায়ুর কোথায় সংবেদনশীলতা নেই বা কার্যক্ষমতা লোপ পেয়েছে তার উপর। ইহা স্নায়ু পরীক্ষা করে নির্ধারন করা যায়। স্নায়ুবেদনা এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা যা সহজে নির্ণয় করা যায় না। হারপিস ভাইরাস দ্বারা সংক্রমনের পর যে স্নায়ুবেদনা হয় তা নির্ণয় করা সহজ কারন হারপিস ভাইরাস সংক্রমনে চামড়াতে ফোঁসকা পড়ে।

স্নায়ুবেদনা নির্ণয় করা অনেক সময় কঠিন এবং ভুল রোগ নির্ণয় খুবই স্বাভাবিক। রোগ নির্ণয় নির্ভর করে ধ্বংশপ্রাপ্ত স্নায়ুকে উত্তেজিত করে কিংবা সংবেদনশীলতা হারানোকে নির্দেশ করে। স্নায়ুবেদনার সাধারন পরীক্ষা হল স্নায়ুর প্রবাহ পরীক্ষা করে দেখা। স্নাবেদনার অর্ন্তনিহিত কারণ কি সেটা জানতে গেলে ব্যথার ইতিহাস জানতে হবে। ব্যথার ধরন কি, রোগীকে পরীক্ষা করতে হে এবং ল্যাবেও পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। যেহেতু ব্যথা রোগীর অনুভূতির উপর নির্ভরশীল কাজেই ইহা ব্যথা নির্ণায়ক স্কেল দ্বারা নির্ধারন করতে হবে। ব্যথার তীব্রতা নির্দেশ করা রোগ নির্ণয়ের জন্যে এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা নির্ণয়ের জন্যে দরকার। রোগী পরীক্ষা করার সময় দেখতে হবে ব্যথা, স্পর্শ, তাপ এবং কম্পনে এর বিপরীতে রোগীর প্রতিক্রিয়া কি? কোন ধরনের উত্তেজনায় রোগীর প্রতিক্রিয়া বেশী তার উপর নির্ভর করে স্নায়ুবেদনারকে ভাগ করা যায়। যেমন চাপজনিত, তাপজনিত ও রসায়ন জনিত স্নায়ুবেদনার । চিকিৎসার প্রতিক্রিয়া কি তা দেখেও অনেক সময় রোগের অর্ন্তনিহিত কারন বুঝা যায়। অনেক সময় মালটিপল স্কেরোসিস রোগেও এই ধরনের ব্যথা দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীর পরিবারের ইতিহাস নিতে হবে। যাহা রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করবে। সিটি স্ক্যান করে তেমন কিছু পাওয়া যায় না বিধায় রোগ নির্ণয় নির্ভর করে উপসর্গের বর্ণনার উপর এবং চিকিৎসার প্রতিক্রিয়ার উপর।

চিকিৎসা:

সাধারনত: ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয় তবে অনেক সময় সার্জারীর দরকার পড়তে পারে। স্নায়ুবেদনার চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন কারণ ব্যথার সাধারণ ওষুধে ইহার তেমন একটা প্রতিকার হয় না। স্নায়ু বেদনা চিকিৎসার জন্যে বিশেষ ওষুধের দরকার পড়ে এবং অনেক সময় বিষন্নতার ওষুধও কাজ করে থাকে। স্নায়ুবেদনা প্রিগাবালিন নামক ওষুধ ব্যবহারে কমে। খিচুনির ওষুধ উচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করলে কিংবা বিষন্নতার ওষুধ ব্যবহার করে স্নায়ুবেদনার চিকিৎসা করা যায়। যদি ওষুধের দ্বারা ব্যথা না কমে বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তখন সার্জারী চিকিৎসার চিন্তা করা যেতে পারে।

মারিজুয়ানা

আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশনের মতে গাঁজা সেবনে স্নায়ুবেদনা কমে।

পরিসংখ্যান:

স্নায়ু বেদনা একটি বিরল রোগ। এই রোগ মহিলারা পুরুষের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে।

 

অধ্যাপক ডাঃ এ কে এম আমিনুল হক

প্রাক্তন অধ্যাপক, মেডিসিন

ঢাকা মেডিকেল কলেজ।

Comments are closed

  • Topics related suggestions: